Social Icons

Wednesday, February 7, 2018

সিসায় মাতোয়ারা ঢাকা-দুই শতাধিক অবৈধ বার

সিসায় ডুবছে রাজধানী ঢাকা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণঅধিদপ্তরের লোকজনকে মাসিক মোটা অঙ্কের টাকা নজরানা দিয়ে সিসা বার চালাচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। এসব লাউঞ্জে সবসময়ই ভিড় লেগে থাকে তরুণ-তরুণীদের। গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানম-ি, মোহাম্মদপুর, বেইলি রোড, উত্তরার অধিকাংশ রেস্টুরেন্টে প্রায় প্রকাশ্যে চলছে সিসা বারের অবৈধ ব্যবসা।

এসব বারে প্রতিঘণ্টা সিসা সেবনের জন্য নেয়া হয় ৪ থেকে ৫শ টাকা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উচ্চবিত্ত পরিবারের উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের নতুন নেশার নাম সিসা। নতুন মাদক হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে সিসার। অনেকটা দেশীয় হুঁকার আদলে তৈরি সিসার প্রচলন সেই মোগল আমল থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সিসা এখন অনেক জনপ্রিয়। বিভিন্ন ফলের নির্যাস দিয়ে তৈরি হয় সিসার উপাদান।
কিন্তু বাংলাদেশে এর সঙ্গে মেশানো হচ্ছে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য তৈরির উপাদান। মাদক হিসেবে তালিকাভুক্তি না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছে না।
ব্যক্তিগত লাভের কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকের তালিকায় নিচ্ছে না সিসাকে। অথচ সিগারেটের চেয়েও ভয়ঙ্কর এ সিসা আগে অভিজাত পরিবারের সন্তানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে সাধারণের নাগালে পৌঁছে গেছে। গাঢ় ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আলো-আঁধারি পরিবেশে চার পাঁচ তরুণ-তরুণী এক টেবিলে গোল হয়ে বসে গুড় গুড় শব্দে পাইপ টানতে থাকে। একই পাইপ এক হাত থেকে যাচ্ছে আরেক হাতে। রাজধানীর অধিকাংশ নামিদামি রেস্টুরেন্টে এমন চিত্র এখন হরহামেশাই মিলছে। নামিদামি রেস্টুরেন্টের মধ্যে আলাদা করে স্থান পাচ্ছে সিসা বার। আর এ সিসায় তরুণ-তরুণীরাই ঝুঁকছে বেশি।
বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের সদস্য ইবনুল সাঈদ রানা জানান, প্রতিবার সিসা টানলে ৫৪টি সিগারেটের সমান ক্ষতি হয়। এ ছাড়া সিসার ধোঁয়ায় প্রচুর পরিমাণে কার্বন মনো-অক্সাইড থাকে, যা মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাদের মতে, সিসা সিগারেটের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। এ ছাড়া সিসায় ফলের নির্যাসের সঙ্গে অন্যান্য ক্ষতিকর মাদকদ্রব্যের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। অন্য মাদকে যে ক্যানসার ছড়াতে পাঁচ বছর লাগবে, সেখানে নিয়মিত সিসায় আসক্ত হলে দুবছরের মধ্যে শরীরে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের উপপরিচালক আলী আসলাম জানান, সিসা সরাসরি মাদক না হলেও বাংলাদেশে এর অপব্যবহার হচ্ছে।
অভিজাত পরিবারের ছেলেমেয়েরা এটিকে মাদক হিসেবে ব্যবহার করছে। সিসার উপাদানের সঙ্গে মাদকদ্রব্য মেশানোর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরো জানান, সিসার সঙ্গে অন্য মাদকের রাসায়নিক পদার্থ মেশানো এবং সিসা লাউঞ্জের আড়ালে মাদক ব্যবসার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাদকের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় সিসা লাউঞ্জের বিরুদ্ধে তারা কোনো অভিযানও চালাতে পারছেন না। সিসাকে মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা উচিত বলে মন্তব্য আলী আসলামের।
স্টিলের তৈরি কারুকার্যময় কলকের মধ্যে সিসার উপাদান রাখা হয়।

কলকের নিচের অংশে থাকে বিশেষ তরল পদার্থ। এটি দেখতে অনেকটা দেশীয় হুঁকার মতো। তবে এটি অনেক বড় আকারের এবং একাধিক ছিদ্রযুক্ত।
 
এসব ছিদ্রে লাগানো থাকে লম্বা পাইপ। এ পাইপ দিয়েই সিসা টানা হয়। সিসা বারে যাতায়াতকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তরুণ-তরুণী জানান, ইয়াবা- ফেনসিডিল বা অন্যান্য মাদক নেয়ার পর সিসা টানতে অন্যরকম অনুভূতি হয়। এ কারণে সিসা পার্টির আগে সবাই সাধারণত অন্যান্য মাদক সেবন করে থাকে।
ছোট ছোট ক্যাবিন। ভেতরে জোড়ায় জোড়ায় তরুণ-তরুণী। উড়ছে নীল ধোঁয়া। নিবুনিবু আলো। হালকা মিউজিকে অন্য রকম এক পরিবেশ। এর মধ্যে আলো-আঁধারীর খেলায় বুঁদ হয়ে তারা হুকোর লম্বা পাইপে ধোঁয়া গিলছে। হুকোর কল্কিতে জ্বলছে কালো সুগন্ধি টিকা। এরা হুকোর মাধ্যমে সিসা নিচ্ছে। মাঝে মাঝেই বেসামাল হয়ে উঠছে তাদের অনেকেই। এটি রাজধানীর বেশির ভাগ সিসা লাউঞ্জের চিত্র।
 শুরুতে শখের বশে যুবক-যুবতীরা সিসা পান করতে গেলেও একপর্যায়ে অনেকেই সিসায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। দেশে ক্রমেই সিসা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। তাত্তি্বক দিক থেকে সিসা মাদকের পর্যায়ে না পড়ার কারণে ‘সিসা লাউঞ্জ’ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (নারকোটিক্স) আওতাধীন নয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশ ক’টি ‘সিসা লাউঞ্জে’ হুক্কার সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ইয়াবা’ (এমফিটামিন), হেরোইন, বিভিন্ন ধরনের মেটাফসফেট ও ‘টেট্রাহাইড্রোকেনাবিনল’। আইনশৃক্সখলা রক্ষাবাহিনীকে ম্যানেজ করে মদের বারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানীর অলিগলিতে গড়ে উঠছে ‘সিসা লাউঞ্জ’। এসব সিসা লাউঞ্জ করতে কোনো অনুমতি লাগছে না। এতে করে সরকার বছরে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে ২০০৮ সালের ১৩ জানুয়ারি নারকেটিক্সের পরিদর্শক হেলাল উদ্দীন ও নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে পৃথক দুটি দল অভিযান চালিয়ে ধানমন্ডির ৫/এ সড়কের ৭৫ নম্বর ভবনের ‘ডেকাগন’ থেকে এক কেজি ও ‘বি-১৫১’ সিসা লাউঞ্জ থেকে চার কেজি ‘টেট্রাহাইড্রোকেনাবিনল’ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় পরদিন ধানমন্ডি থানায় দুটি মামলা হয়। বর্তমানে মামলা দুটি আদালতে বিচারাধীন।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, পান সালসা, লিমোরা ডিলাইট, অরেঞ্জ কাউন্টি, ওয়াইল্ড মিন্ট, কিউই, ট্রিপল আপেল, চকো লাভা, ক্রেজি কেয়ারি, ব্লু বেরি ফ্লেভারের ধুয়া তুলে বর্তমানে রাজধানীর অন্তত ৫০টি বার ও ৩০০ বাসায় নিয়মিত সিসার আসর বসছে। রাজধানীতে সিসাসেবীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এদের ১৫ হাজার ইয়াবা কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। নামকরা সিসা লাউঞ্জের মধ্যে ধানমন্ডির সেভেন টুয়েলভ লাউঞ্জ, ডমিনেন্স পিজা, কিউকিউটি অ্যান্ড লাউঞ্জ, এইচ টু ওয়াটার লাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, ঝাল লাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, মোহাম্মদপুরের অ্যারাবিয়ান নাইটস্, গুলশানের একজিট লাউঞ্জ, জোন জিরো লাউঞ্জ, মাউন্ট আট্টা লাউঞ্জ, জাবেদ কাড লাউঞ্জ, ক্লাব অ্যারাবিয়ান, হাবুল-বাবুল, বনানীর মিলাউন্স, ডকসিন, কফি হাউস, বেজিং লাউঞ্জ, মিট লাউঞ্জ, সিক্সথ ফ্লোর, বেইলি রোডের থার্টি থ্রি, মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের ফুড কিং, খিলক্ষেতের হোটেল রিজেন্সি উল্লেখযোগ্য।
 সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা সিসার অপব্যবহার রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের আওতায় নিয়ে আসা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও আইনশৃক্সখলা রক্ষাবাহিনীর অভিযান পরিচালনাসহ নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা, পারিবারিক শাসন অথবা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সিসা সেবন বন্ধ করার বিষয়ে সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সেশনে উৎপাদিত সিসার ধোঁয়ার পরিমাণ ১০০ সিগারেটের সমান, যার মধ্যে উচ্চমাত্রার টক্সিন, কার্বন-মনোক্সাইড, হেভি মেটালসহ অন্যান্য ক্যানসার উৎপাদনকারী পদার্থ থেকে যায়। এতে নিকোটিনের পরিমাণও সিগারেটের দ্বিগুণ। তাই শীঘ্রই সিসা লাউঞ্জকে সরকারের কোনো একটি সংস্থার অধীনে নেওয়া উচিত।
 ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, সিসা লাউঞ্জে তাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। অপকর্মের বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। নারকোটিক্স ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক মুজিবর রহমান পাটোয়ারী জানান, সিসা মাদক না হওয়ায় তারা সিসা লাউঞ্জে অভিযান চালাতে পারছেন না। তবে বিভিন্ন লাউঞ্জ থেকে নিয়মিত স্যাম্পল সংগ্রহ করছেন এবং গোয়েন্দা তৎপরতা চালাচ্ছেন।


No comments:

Post a Comment

 

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

সম্পাদকীয় কার্যলয়

Rua padre germano mayar, cristo rio -80040-170 Curitiba, Brazil. Contact: +55 41 30583822 email: worldnewsbbr@gmail.com Website: http://worldnewsbbr.blogspot.com.br

সম্পাদক ও প্রকাশক

Jahangir Alom
Email- worldnewsbb2@gmail.com
worldnewsbbbrazil@gmail.com
 
Blogger Templates