Social Icons

Thursday, August 11, 2016

সত্য প্রকাশের জবানিতে গুলশানের কালরাত

গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন হাসনাত রেজা করিম ও তাহমিদ হাসিব খানের ৮ দিনের রিমান্ড শেষ হচ্ছে আজ। এ দুই সন্দেহভাজনের মধ্যে হাসনাত রেজা করিমকে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। এ মামলার প্রথম আসামি হিসেবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে সাত দিনের পুলিশ রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে। তবে তাহমিদ হাসিব খানকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে না। তাকে ৫৪ ধারাতেই ফের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে হলি আর্টিজানের হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া জিম্মিদের মধ্যে যারা আদালত ও পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক সত্যপ্রকাশও রয়েছেন। গত ২৬ জুলাই ঢাকা মহানগর হাকিমের আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। সাক্ষী হিসেবে দেওয়া তার এ জবানবন্দির একটি কপি আমাদের সময়ের কাছেও এসেছে। ইংরেজি ভাষায় হাতে লেখা ৮ পৃষ্ঠার এ জবানবন্দিতে ঘটনার রাতে জিম্মি হওয়া থেকে শুরু করে উদ্ধার হওয়া পর্যন্ত হলি আর্টিজানে অবস্থানকালে তিনি যা দেখেছেন ও বুঝেছেন, জবানবন্দিতে সেই বর্ণনা তুলে ধরেছেন। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় অন্যতম দুই সন্দেহভাজন হাসনাত রেজা করিম এবং তাহমিদ হাসিব খান সম্পর্কেও বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরেন সত্যপ্রকাশ। জঙ্গিরা তাহমিদ হাসিব খান, হাসনাত রেজা করিম এবং অন্যদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করেছেন, তারও বর্ণনা দিয়েছেন সত্যপ্রকাশ। গণমাধ্যমে ইতোমধ্যে তাহমিদ হাসিব খান ও হাসনাত রেজা করিমের কিছু ছবি ছাপা হয়েছে। ছবিতে দেখা গেছে, হলি আর্টিজানের ছাদে জঙ্গিদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন এ দুই সন্দেহভাজন। তাদের মধ্যে তাহমিদের হাতে একটি অস্ত্র দেখা গেছে। যে অস্ত্রে গুলি ছিল না বলে তাহমিদ পুলিশ রিমান্ডে জানিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ডিআইজি মনিরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, হাসনাত রেজা করিমকে তারা হলি আর্টিজানের মামলায় গ্রেপ্তার দেখাচ্ছেন। তবে তাহমিদকে গ্রেপ্তার দেখাচ্ছেন না। তিনি বলেন, হলি আর্টিজানের ছাদে জঙ্গিদের সঙ্গে দাঁড়ানো তাহমিদ ও হানসাতের যে ছবি গণমাধ্যমে এসেছে, ওই ছবি যেন সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম তদন্ত কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিতে আদালতের কাছে আবেদন করবে পুলিশ।
দৈনিক আমাদের সময়-এর পাঠকের জন্য সত্যপ্রকাশের ইংরেজিতে দেওয়া জবানবন্দির হুবহু বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হল:
সেদিন ছিল শুক্রবার। আমি হলি আর্টিজান বেকারিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমি নিজের গাড়িতে করে সেখানে যাই। গাড়িটি সেখানে পার্ক করি। রাত সাড়ে ৮টায় আমি ভেতরে যাই। আমি বাইরে কোনার টেবিলে বসি, যেটি সামনের দিকে মুখ করা।
এ সময় তন্ময় নামে আমার এক বন্ধুকে ফোন করি। সে বলে, সে খাবে না তবে পরে আমার সঙ্গে যোগ দেবে। আমি পাস্তা ও তাজা কমলার জুস অর্ডার দিই। তারা আমাকে পরিপূরক খাবার হিসেবে পাউরুটি ও সসেজ দিল। আমি আমার বন্ধুর জন্য অপো করছিলাম। হঠাৎ আমি দেখতে পাই দুই-তিনজন লোক রেস্টুরেন্টের প্রধান ফটকটি ঠেলাঠেলি করছে। ঠিক সে সময় আমি শব্দ শুনলাম যা আমার কাছে পটকার শব্দ বলে মনে হলো। অতর্কিতে ছয়-সাতজন লোক রেস্টুরেন্টের দিকে দৌড়ে আসছিল। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম এবং স্থির হয়ে গেলাম। তৎক্ষণাৎ আমি বন্দুকের গুলির শব্দ পেলাম এবং একজন লোককে পড়ে যেতে দেখলাম। একই সময়ে আমি ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান শুনতে পেলাম। আমি একটি স্তম্ভের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমি একটি লোককে মুখে দুহাত দিয়ে দৌড়াতে দেখলাম, তার মুখে ছিল রক্ত। তাকে দেখতে জাপান, চিন, কোরিয়ার নাগরিকের মতো দূরপ্রাচ্যের দেশের একজন বলে মনে হচ্ছিল। আমি সম্ভাব্য যে কোনো উপায়ে ওই স্থান ত্যাগের চিন্তা করছিলাম। সেখানে শ্রীলঙ্কার এক দম্পতিও ছিল, যারা আমার পূর্বপরিচিত, তারাও নিজেদের লুকাতে স্তম্ভের পেছনে চলে এলেন। আমি জানালা দিয়ে দেখলাম যে, হামলাকারীদের মধ্যে একজন মাটিতে পড়ে থাকা এক লোককে ধারালো বস্তু দিয়ে আঘাত করছে।
আমি অবিলম্বে আমার চোখ স্থির করলাম। ওই দম্পতি আসার পর পরই এক হামলাকারীও উদয় হলো এবং বলল, ‘‘লুকাবেন না, আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করতে যাচ্ছি না। আপনারা এখানে নিরাপদ নন, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসুন।’’ নির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা বেরিয়ে এলাম। একই লোক আমাদের বলল, আমরা যেন মোবাইল ফোন ব্যবহার না করি। আমি তাকে আমার মোবাইল ফোন দিয়ে দিলাম এবং শ্রীলঙ্কান দম্পতি (মহিলা) ব্যাগটি ছুড়ে দিল। সেটি গিয়ে হামলাকারীর কাছে পড়ল। হামলাকারী জানতে চাইল, ‘আর ইউ বাঙালি’। আমি বললাম, ‘ইয়েস আমি বাঙালি।’
(সাক্ষী কিঞ্চিৎ বাংলা বলতে পারে এবং বাংলা কথোপকথনের অধিকাংশই বুঝতে সক্ষম) হামলাকারী বাংলায় বলল, শুয়ে পড়তে। আমি শুয়ে পড়লাম কিন্তু ওই শ্রীলঙ্কান দম্পতি তখনো দাঁড়িয়ে আছে। তখন ওই হামলাকারী (সঙ্গে বন্দুকযুক্ত) আমাকে ভেতরে যেতে বলল এবং বাংলাদেশি লোকদের সঙ্গে বসতে বলল। সে আমাকে বাধ্য করল মাথা টেবিলে রেখে চেয়ারে বসতে। সেখানে দুটো মেয়ে ছিল যারা নিজেদের টেবিলের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল। হামলাকারীরা তাদের বেরিয়ে এসে আমার পাশে বসতে বলল। আমি আমার মাথা পুরোপুরি টেবিলে ঠেকাতে পারছিলাম না বলে কেউ আমার মাথায় আঘাত করে। ওই মেয়েরা ও এক তরুণ হামলাকারীর কাছে অনুরোধ করছিল তাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য। হামলাকারী জবাব দেয়, ‘আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না যদি আমাদের বিবেচনায় আপনারা কাফের না হন।’ তারা বলছিল যে, তারা সে লোকের কোনো ক্ষতি করবে না, যে কাফের নয়।
হামলাকারীদের মধ্যে একজন ইংরেজিতে বলল যে, আপনারা কি জানেন যে, সিরিয়ায় কীভাবে আমাদের মুসলিম ভাই ও বোনেরা নির্যাতিত ও হত্যার শিকার হচ্ছেন। তারা ইংরেজি ও বাংলা দুটো ভাষাতেই কথা বলছিল। আমি শুনতে পেলাম হামলাকারীদের মধ্যে একজন এক তরুণের সঙ্গে ইসলাম প্রসঙ্গে কথা বলছে (পরে আমি জানি যে, ওই যুবকের নাম তাহমিদ)। তারা আমাদের মোবাইল ফোনের কল রিসিভ করতে বলে। আমি আমার মোবাইল ফোন বন্ধ করে ফেলি। এক হামলাকারী আমাকে জিজ্ঞেস করে, মিডিয়া কিংবা পুলিশের কাউকে আমি চিনি কিনা। আমি জবাব দিই ‘না’। এ কথা শুনে একটি মেয়ে সাড়া দেয় এবং তার মাকে ফোন করে লাউড স্পিকার অন করে। সে বলে, ‘আম্মা তাড়াতাড়ি বেনজির আঙ্কেলকে বলো, আমি এখানে (গুলশান) আটকে আছি।’ মেয়েটির মা ওই ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না। সে সময় আরেকটি ফোন বেজে ওঠে। আমার মুখোমুখি বসা এক লোক লাউড স্পিকারে কথা বলেন (পরে আমি জানতে পারি তিনি হাসনাত)। ফোনের কথোপকথন আমি মনে করতে পারছি না।
এরপর তারা আমাদের পানি ও মাফিন (পিঠাবিশেষ) খেতে দেয়। তারা আমাদের বাথরুমও ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। আমি যখন বাথরুমে যাচ্ছিলাম, আমি দেখি এক নারী সিঁড়ির গোড়ায় পড়ে আছেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখ ঢেকে ফেলি। কিছু সময় পর আমি শুনতে পাই, হামলাকারীরা রেস্তোরাঁর এক স্টাফকে বলে রান্নাঘরের ভেতরে যারা আছে তাদের যেন রান্নাঘরটি খুলে দিতে বলা হয়। ওই স্টাফ তখন ভেতরের লোকজনকে আশ্বস্ত করছিল যে, হামলাকারীরা বাংলাদেশিদের কোনো ক্ষতি করবে না।
এরপর, হামলাকারীরা কিছু সময় ব্যর্থ হওয়ার পর রেফ্রিজারেটরটি খুলতে সমর্থ হয়। সেখানে তারা দুজনকে খুঁজে পায়। এর মধ্যে একজন রেস্টুরেন্টটির স্টাফ, অন্যজন জাপানি (জাপানি ভাষায় কথা বলছিলেন)। তারা বাংলাদেশিকে অন্যদের সঙ্গে বসতে দেয় এবং জাপানিকে গুলি করে। তারা জাপানিকে জিজ্ঞেস করছিল যে, সে বেঁচে আছে কিনা। জাপানি জবাব দেন, ‘হ্যাঁ’। লোকটি তাকে আবার গুলি করে। গুলি করার আগে তারা আমাদের কানে হাত দিতে এবং শিশুদের মুখ ঢেকে দিতে বলে। একই সময় আমি যন্ত্রণায় গোঙানো একটি নারীকণ্ঠ শুনতে পাই। লোকটি তাকে কোপাচ্ছিল আর বলছিল, ‘মহিলা মরতেছে না’।
আমি তাদের দেখি, কাচের দরজার দুপাশে দুটি বড় গ্যাস সিলিন্ডার রাখতে। তারা মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ ব্যবহার করছিল। তারা মোবাইল ফোন থেকে খবর পড়ছিল এবং হাসছিল এই বলে যে, ‘ইতিপূর্বে তারা আমাদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করছিল। এখন তারা আমাদের বলছে জঙ্গি। জানি না তারা আগামীকাল আমাদের কী বলে ডাকবে। এক পর্যায়ে তারা (হামলাকারী) বাংলা ভাষায় উচ্চৈঃস্বরে একটি মেসেজ পড়ে। মেসেজটি ছিল তাদের কার্যকলাপের জন্য তাদের অভিনন্দিত করার। বার্তাটি অনেক বড় ছিল। সবটা আমি মনে করতে পারছি না। কিন্তু এটি ছিল সে সম্পর্কে যে, তারা খুব ভালো একটি কাজ করেছে। তাদের ভাইয়েরা তাদের নিয়ে গর্বিত। এরপর তারা সেহরি পরিবেশন করে। সন্দেহ এড়াতে আমি অল্প কিছু খাই।
সেহরির পর তারা আবারও আমাদের বলে টেবিলে মাথা নুয়ে রাখতে। আমার আবছাভাবে মনে পড়ে, কেউ একজন নির্দেশনা দিচ্ছে যে, দুজন (হামলাকারী) থাকবে ওপরের সিঁড়িতে, দুজন নিচের সিঁড়িতে এবং একজন কিছু একটা করবে যা আমি মনে করতে পারছি না।
পরে, তারা দুই ব্যক্তিকে (অঙ্গুলিনির্দেশপূর্বক) তাদের (হামলাকারী) কাছে আসতে বলে। আমি তাদের সিঁড়ি দিয়ে যেতে দেখি। কিছু সময় পর তারা ফিরে আসে এবং আমার পাশে টেবিলে মাথা নিচু করে বসে। এ সময় আমি দেখি চারপাশে শুধু হামলাকারীরা চলাফেরা করছে। আমি দেখি টাক মাথার এক লোক (হাসনাত) সামনের দরজা খুলছেন। আমিসহ অন্যরা উঠে দাঁড়াই এবং তারা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে বলে। হঠাৎ আমি দেখি, এক ব্যক্তি (হামলাকারী) তাহমিদকে পবিত্র কোরআন দিচ্ছে। কিন্তু সে তা নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আমি তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তারা আমাদের ফোনগুলো ফেরত দেয় (টেবিলে বিছিয়ে রাখে) এবং আমরা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য হাঁটতে শুরু করি। এটাই আমার জবানবন্দি।

No comments:

Post a Comment

 

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

সম্পাদকীয় কার্যলয়

Rua padre germano mayar, cristo rio -80040-170 Curitiba, Brazil. Contact: +55 41 30583822 email: worldnewsbbr@gmail.com Website: http://worldnewsbbr.blogspot.com.br

সম্পাদক ও প্রকাশক

Jahangir Alom
Email- worldnewsbb2@gmail.com
worldnewsbbbrazil@gmail.com
 
Blogger Templates