Social Icons

Wednesday, August 17, 2016

ব্রাজিল নতজানু, তুরস্ক অটল

তুরস্কে ১৫ জুলাই একটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানচেষ্টা হয়েছিল। গুলেনবাদী সেনাকর্মকর্তা ও সৈনিকেরা আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও সড়ক অবস্থানগুলোতে প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করে, জেনারেল স্টাফ সদরদফতর দখল করে নেয়। তারা নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং দেশের সরকারকে নির্মূল করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে জনগণ যখন রাস্তায় নেমে আসে, লড়াই শুরু করে দেয়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, অভ্যুত্থানটি সফল হবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২৫০ ব্যক্তি, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক, নিহত হয়। তারপর থেকে বিপুলসংখ্যক লোককে, যাদের বেশির ভাগ সামরিক বাহিনীর, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, অভ্যুত্থানটি চালানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা ফতেহউল্লেহ গুলেনের নির্দেশে। তুরস্ক সরকার ইতোমধ্যেই তাকে প্রত্যাবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করেছে, এর জবাব এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
তুরস্কে এটা ছিল ২০১৩ সালের পর থেকে তৃতীয় ব্যর্থ অভ্যুত্থান। প্রথমটি হয়েছিল ২০১৩ সালের মে ও জুনে গেজি পার্কে। এরপর একই বছরের ডিসেম্বরে দুর্নীতির অভিযোগ এনে সরকারকে উৎখাত করার একটি চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
আরেকটি দেশ তুরস্কের মতোই অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল। দেশটির নাম ব্রাজিল। তারা কিন্তু প্রতিরোধ করতে পারেনি। দ্বিতীয় চেষ্টাতেই গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি ধরাশায়ী হয়ে যায়।
মজার ব্যাপার হলো, তুরস্কে প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টি এবং লুই ইনাসিও লুলা ডি সিলভার নেতৃত্বধীন ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টি উভয়েই ক্ষমতাসীন হয় ২০০২ সালে। উভয় দেশই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ছিল এবং নিজ নিজ নেতাদের সংস্কারের ফলে স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে। নির্বাচনে একে পার্টি ও ওয়ার্কার্স পার্টির জয় অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফলে প্রায় ধসে পড়া দেশ দু’টির স্থিতিশীলতার প্রতি নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষের আকাক্সক্ষাই প্রতিফলিত হয়েছে। উভয় দেশের জিডিপি ব্যাপকভাবে বেড়েছে, বিদেশী বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ এলাকায় পরিণত হয়েছে।
লুলার ব্রাজিল এবং এরদোগানের তুরস্ক স্থিতিশীলতা ও দ্রুত উন্নয়ন প্রদর্শন করেছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে আরো বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। উভয় দেশ অবাধ বাজারের নিয়মনীতি অনুযায়ী কাজ করলেও একই সাথে জাতীয় অর্থনীতিও সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০০৭ সালের পর থেকে তাদের অর্থনৈতিক মর্যাদা পাশ্চাত্যের অনেক দেশের সমানতালে চলতে থাকে। ব্রাজিল ও তুরস্কের নেতৃত্ব বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের দ্বিমত প্রকাশ করতে থাকে। ইরানের অসামরিক পরমাণু কর্মসূচির প্রতি সমর্থন দিতে পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি সত্ত্বেও উভয় নেতা ২০১০ সালে তেহরান সফর করেন। পাশ্চাত্যের পরমাণু কর্মসূচি প্রশ্নে কাগজে-কলমে থাকা নীতিমালা এই দুই নেতা লঙ্ঘন না করলেও এই পদক্ষেপে পাশ্চাত্য নেতারা খুশি হননি।
একইভাবে ইসরাইলের ফিলিস্তিন দখল প্রশ্নেও উভয় দেশ একই অবস্থান গ্রহণ করেছে, যা পাশ্চাত্যের সম্পূর্ণ ভিন্ন। উভয় দেশ মনে করে, ইসরাইলের উচিত ১৯৬৭ সালের সীমান্তে ফিরে যাওয়া, অবৈধ ইহুদি উপনিবেশ বসতি স্থাপন বন্ধ করা এবং গাজায় অবরোধের অবসান ঘটানো। পাশ্চাত্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর নীতির সাথে দ্বিমত করার পাশাপাশি তারা জাতিসঙ্ঘের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলছিলেন। তাদের মতে, জাতিসঙ্ঘ আসলে পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতিই বাস্তবায়ন করে থাকে।
পরপর দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালনের পর লুলা তার ঘনিষ্ঠজন ও সহকর্মী দিলমা রউসেফের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ২০১১ সালে। তিনি পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে লুলার পদক্ষেপই অনুসরণ করেন। ২০০২ সালে যেখানে জনসংখ্যার মাত্র ৩৮ ভাগ ছিল মধ্যবিত্ত, সেখানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দাঁড়ায় ৫৫ ভাগ। এটা সম্ভব হয়েছিল লুলা ও রউসেফের সফল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অর্থনৈতিক নীতির কারণে। ২০০৭ সাল থেকে তুরস্ক ও ব্রাজিলের স্থিতিশীল অর্থনীতি, উন্নত দেশ হয়ে ওঠার পথে চলা পাশ্চাত্যের প্রতিবন্ধকতায় থাকা অনেক দেশের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করে।
আবার কাকতালীয়ভাবে কিংবা অন্য যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, তুরস্ক ও ব্রাজিলে একই সাথে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। গেজি পার্ক নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছিল ওই উদ্যানে সামান্য কিছু সংস্কারমূলক কার্যক্রম হাতে নেয়ায়। এটা শুরু করেছিল একটি ছোট গ্রুপ। বিক্ষোভটি বড় হয়ে তুরস্কজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পাশ্চাত্য মিডিয়ার উৎসাহে তারা এরদোগানের পদত্যাগ দাবি করতে থাকে। জনপ্রিয় নির্বাচিত নেতার বিরুদ্ধে মিডিয়া প্রচারণাটি দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং ছিল খোদ তুরস্কেরই বিরুদ্ধে। পরে জানা যায়, পুলিশবাহিনীর মধ্যে থাকা গুলেনপন্থীদের কলকাঠি নাড়ার কারণেই এই বিক্ষোভ নাটকীয়ভাবে এত বড় হয়ে উঠতে পেরেছিল। এটা ছিল তুরস্কে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতে গুলেনপন্থীদের প্রথম চেষ্টা।
অন্য দিকে ব্রাজিলের লোকজন গণপরিবহন নিয়ে বিক্ষোভ করেছিল। সেটা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সরকারের পদত্যাগ দাবি করতে থাকে। তারা সরকারি ভবনে হামলা চালায়। উভয় দেশেই সরকারের সিদ্ধান্তসূচক কার্যক্রমের ফলে বিক্ষোভ বন্ধ হয়। তবে তার মানে এই নয়, প্রতিপক্ষ হাল ছেড়ে দিয়েছে।
তুরস্কে ২০১৩ সালে চার মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। ব্যক্তিগত দুর্নীতির মামলাগুলো কোনোভাবে তালগোল পাকিয়ে ওঠে, এরদোগান এবং তার পরিবারকেও এর মধ্যে জড়িয়ে ফেলা হয়। পরে দেখা যায়, এগুলো মিথ্যা অভিযোগ। এগুলো ছিল আসলে গুলেনপন্থী, নিরাপত্তা সংস্থা এবং বিচার বিভাগের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র। তবে পাশ্চাত্য মিডিয়া কিন্তু গুলেনপন্থীদের তৎপরতা চেপে গিয়েছে। তারা বরং ষড়যন্ত্রকারীদের কার্যক্রমকেই সমর্থন করতে থাকে এরদোগান প্রশাসনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে।
তুরস্কে এই বিশেষ অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হলেও ব্রাজিল সরকারকে কিন্তু উৎখাত করা হয় দুর্নীতির অভিযোগ এনেই। তুরস্কে যেমন গুলেনপন্থী এমপিদের দিয়ে অভ্যুত্থানচেষ্টা করা হয়েছিল, একইভাবে ব্রাজিলেও ওয়ার্কার্স পার্টির এমপিরা অভ্যুত্থানকে সমর্থন করে বসেন। অভ্যুত্থানে জড়িত কিছু রাজনীতিবিদ ও বিচারক লুলা ও রউসেফকে ফাঁসানোর কাজ সম্পন্ন করেন।
লুলা ও রউসেফের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযান শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের মধ্যভাগ থেকে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি পেট্রোবাসের কয়েকজন ম্যানেজার ১০ বছর ধরে কয়েকজন রাজনীতিবিদকে ঘুষ দিয়ে আসছিলেন। প্রথমে তেমন গুরুত্ব না থাকা কয়েকজন রাজনীতিবিদের দিকেই অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু তারপর বিচারকেরা রউসেফ ও লুলাকে অভিযুক্ত করতে থাকেন। তাদের যুক্তি ছিল লুলা ও রউসেফ উভয়ে ছিলেন পেট্রোবাসের পরিচালনা পরিষদের সদস্য। এসব অভিযোগের এক বছর আগে জানা গিয়েছিল, আমেরিকা পেট্রোবাসের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে, ব্রাজিলের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টেলিকমিউনিকেশন-ব্যবস্থায় আড়ি পেতে রউসেফের কথাবার্তা টেপ করছিল। এতে আরো জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়, পেট্রোবাস কেলেঙ্কারিতে লুলা ও রউসেফকে জড়িয়ে ফেলে তাদেরকে নামিয়ে ফেলার কাজে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
লুলা বা রউসেফের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ না থাকলেও গত ১২ মে তাদের দলের এমপিদের ভোটে রউসেফকে দল থেকে সাসপেন্ড করা হয়। অভ্যুত্থান হয়ে যায়। সিআইএ’র ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত মাইকেল তেমার হন ব্রাজিলের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট।
ব্রাজিল এই অভ্যুত্থান প্রতিরোধ করতে পারেনি। তবে তুরস্ক আরেকবার জীবন পেয়েছে। তুরস্কের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য দেশগুলো ছিল ১৫ জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনে।
ব্রাজিল আন্তর্জাতিক দৃশ্যপট থেকে সরে গেলেও তুরস্ক আরো জোরালোভাবে তার অবস্থান প্রকাশ করেছে। এ দেশটিই এখন পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছে।
(মিডল ইস্ট মনিটর থেকে)

No comments:

Post a Comment

 

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

সম্পাদকীয় কার্যলয়

Rua padre germano mayar, cristo rio -80040-170 Curitiba, Brazil. Contact: +55 41 30583822 email: worldnewsbbr@gmail.com Website: http://worldnewsbbr.blogspot.com.br

সম্পাদক ও প্রকাশক

Jahangir Alom
Email- worldnewsbb2@gmail.com
worldnewsbbbrazil@gmail.com
 
Blogger Templates