Saturday, February 13, 2016
পহেলা ফাল্গুন আজ
আজ শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিন- পহেলা ফাল্গুন। ফুলেল বসন্ত, মধুময় বসন্ত, যৌবনের উদ্দামতা বয়ে আনার বসন্ত আর আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও উদ্বেলতায় মন-প্রাণ কেড়ে নেওয়ার বসন্তের প্রথম দিন আজ। ফুল ফোটানোর পুলকিত সময় আজ। বসন্ত বাতাসে বন্ধুর বাড়ির ফুলের সুবাসে মন আনচান করার প্রথম দিন আজ। মাতাল হাওয়া, উড়াল মৌমাছিদের গুঞ্জরণ, গাছের কচিপাতা আর কোকিলের কুহুতানে জেগে ওঠার দিন। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়- 'ফুল ফুটুক আর না ফুটুক/আজ বসন্ত...।' তবে এবারও ফুল ফুটেছে। দখিন হাওয়ার গুঞ্জরণও লেগেছে ফাগুন আসার দু-একদিন আগে থেকেই। ফাগুন হাওয়ার দোল লেগেছে বাংলার নিসর্গ প্রকৃতিতে। ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে উঠছে প্রকৃতির সবুজ অঙ্গন। মাঘের শেষ দিক থেকেই গাছে গাছে ফুটছে আমের মুকুল। শীতে খোলসে নিজেকে ঢেকে রাখা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম এখন অলৌকিক স্পর্শে জেগে উঠেছে। মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে বসন্ত জানিয়ে দিচ্ছে, সত্যি সত্যি সে ঋতুর রাজা। স্বাগত বসন্ত। প্রাণ খুলে তাই যেন কবির ভাষায় বলা যায়, 'আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে/এত বাঁশি বাজে/এত পাখি গায়...।' রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গানের আকুতি যেন ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে- 'ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/আমার আপনহারা প্রাণ/আমার বাঁধন ছেঁড়া প্রাণ/তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/তোমার অশোকে কিংশুকে/অলক্ষ্যে রঙ লাগল আমার অকারণের সুখে...।' বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রং ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তরঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির ওপরও রং ছড়ায়। বায়ান্ন সালের আট ফাল্গুন বা একুশের পলাশরাঙা দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। ঋতুচক্র যেন এখন আর পঞ্জিকার অনুশাসন মানতে চায় না। কুয়াশার চাদরে মোড়া শীত জেঁকে বসতে না বসতেই বিদায়। প্রকৃতির দিকে তাকালে শীত-বর্ষার মতো বসন্তকেও অনেক সময় সহজে চেনা যায় না। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে ঋতুচক্রেও এসেছে নতুন ব্যঞ্জনা। সময় মতো শীত আসে না, বর্ষাও তা-ই। গ্রীষ্মের খরতাপও মানে না নিয়ম। এসবের মধ্যেও যেন অনেকটা সগৌরবে দীপ্যমান বসন্ত। প্রকৃতির এ আনন্দবার্তায় নাগরিক মনও তাই উচ্ছ্বসিত। বাঙালির জীবনে বসন্তের উপস্থিতি অনাদিকাল থেকেই। কবিতা, গান, নৃত্য আর চিত্রকলায় আছে বসন্তের বন্দনা। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই করে নিয়েছে নানা অনুপ্রাস, উপমা ও উৎপ্রেক্ষায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিককালের বাউল কবির মনকেও বারবার দুলিয়েছে ঋতুরাজ বসন্ত। সে জন্যই 'বসন্ত বাতাসে বন্ধুর বাড়ির ফুলের সুবাসে মন আনচান' করে বাউল কবির। ষড়ঋতুর দেশে আবহমান গ্রামবাংলার প্রকৃতিতেই মূলত বসন্ত জানান দেয় তার আগমনীবার্তা। গ্রামের মেঠোপথ, নদীর পাড়, গাছ, মাঠভরা ফসলের ক্ষেত বসন্তের রংয়ে রঙিন হয়ে ওঠে। চোখ বুজলেও টের পাওয়া যায় এসব দৃশ্যপট। তবে নগরজীবনেও বসন্তও ছন্দ তোলে মৃদু হিল্লোলে। কংক্রিটের নগরীতে কোকিলের কুহুস্বর ধ্বনিত হয় ফাগুনের আগমন সামনে রেখে। যানজট, কোলাহল ছাপিয়েও যেটুকু প্রকৃতি খুঁজে পাওয়া যায় নগরে, একেই অতি আপন করে নেন নগরের কর্মব্যস্ত মানুষ। যতই নিষ্প্রাণ, হিসেবি, প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন হন না কেন, বসন্তের এ দিনে তারা গেয়ে ওঠেন 'বসন্ত ছুঁয়েছে আমাকে/ঘুমন্ত মন তাই জেগেছে...।' নেচে ওঠে তাদের মন। অন্যবারের মতো ফাগুনের প্রথম দিনে আজ তারা মিলিত হবেন মনকে বসন্তের রংয়ে রাঙিয়ে। প্রীতির বন্ধনে আপন মহিমায় খুঁজে নেবেন বসন্তকে। তরুণ-তরুণীরা বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশের বইমেলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শাহবাগ, চারুকলা চত্বর, পাবলিক লাইব্রেরি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মাতিয়ে রাখবেন সারাদিন। তারা বাসন্তী রংয়ের পোশাকে নিজেকে রাঙিয়ে নেবে। তরুণীরা বাসন্তী রংয়ের শাড়ি পরে খোঁপায় গাঁদা, পলাশসহ নানা ফুল গুঁজে আর তরুণরা বাসন্তী রংয়ের পাঞ্জাবি ও ফতুয়ায় নতুন করে নিজেদের সাজিয়ে নেমে আসবেন পথে পথে। নগরীর বিভিন্ন উদ্যান, ফাস্টফুড, ক্যাফেও মুখর থাকবে। ফোন, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলবে তাদের বসন্তের শুভেচ্ছা বিনিময়। গাছ কাটা আর ফ্ল্যাট সংস্কৃতির প্রবল চাপের মুখে রাজধানীতে যেটুকু সামান্য সবুজ আছে, সেখানে আজ জড়ো হবেন তরুণ-তরুণীরা। বোটানিক্যাল গার্ডেন, রমনা পার্ক, বনানী লেক, ধানমণ্ডি লেক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, মিন্টো রোড, হেয়ার রোড, বলধা গার্ডেন, চারুকলার পেছনের সবুজ প্রাঙ্গণে আজ দিনভর চলবে তাদের বসন্তের উচ্ছ্বাস প্রকাশ।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)


No comments:
Post a Comment